জন ক্যাম্পবেল, শেই হোপ ও আমির জাঙ্গুর সেঞ্চুরিতে ওয়ানডেতে প্রথমবারের মতো চারশ রান করল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু ক্যারিবিয়ানদের বিশাল সংগ্রহকে একেবারেই পাত্তা দিলেন না রোহিত শার্মা ও শুবমান গিল। সাবেক অধিনায়কের সেঞ্চুরি এবং বর্তমান অধিনায়কের অবিশ্বাস্য দ্বিশতকে রানের পাহাড় টপকে গেল ভারত। গড়ল রান তাড়ার রেকর্ড, এক ম্যাচ বাকি থাকতেই নিশ্চিত করল সিরিজ জয়।
গুয়াহাটিতে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রান উৎসবের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৮ উইকেটে জিতেছে ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪০৫ রান ৩৯ বল হাতে রেখেই পেরিয়ে যায় তারা।
ওয়ানডেতে এটি চারশর বেশি রান তাড়া করে জয়ের মাত্র দ্বিতীয় নজির। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ রান তাড়া করে জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। এখনো সেটিই এই সংস্করণে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড।
ভারতের আগের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয় ছিল ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৬০ রানের লক্ষ্য পেরিয়ে।
এদিন নবমবারের মতো ওয়ানডেতে চারশর বেশি রান করল ভারত - যা বিশ্ব রেকর্ড। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আটবার এই কীর্তি আছে দক্ষিণ আফ্রিকার।
দুই দল মিলে ম্যাচে রান হয়েছে ৮১১। ওয়ানডেতে এর চেয়ে বেশি রান হয়েছে কেবল দুটি ম্যাচে। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে ৮৭২ এবং ২০০৯ সালে ভারত-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে ৮২৫ রান হয়েছিল।
টানা দুই জয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ নিশ্চিত করেছে ভারত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এটি তাদের টানা ১৪তম ওয়ানডে সিরিজ জয়। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টানা এত বেশি সিরিজ জয়ের নজির আর কোনো দলের নেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পাকিস্তানের টানা ১২ সিরিজ জয়ের রেকর্ড ছিল এর আগে সর্বোচ্চ।
ম্যাচের প্রথম ভাগ অবশ্য পুরোপুরিই ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের দখলে। পাঁচটি ছক্কা ও নয়টি চারে ৬৮ বলে ১০১ রানের ঝোড়ো ইনিংসে দলকে উড়ন্ত সূচনা দেন ক্যাম্পবেল। পরে অধিনায়ক হোপ দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে ১০৪ রান করেন। তার ইনিংসে ছিল তিনটি ছক্কা ও আটটি চার।
এরপর ঝড় তোলেন জাঙ্গু। তিনটি ছক্কা ও ১৩টি চারে ৭৭ বলে ১১৪ রান করেন তিনি। একপর্যায়ে সাড়ে চারশর সম্ভাবনা জাগিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শেষ দিকে দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে ৪০৫ রানে থামে তারা।
তাতেই নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাসে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়ে ক্যারিবিয়ানরা। এর আগে এই সংস্করণে তাদের সর্বোচ্চ ছিল ৩৮৯ রান, ২০১৯ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
জবাবে রোহিত শার্মা শুরু থেকেই ছিলেন আগ্রাসী। ৭৫ বলে ছয়টি ছক্কা ও ১০টি চারে ১০১ রান করেন তিনি। এটি ওয়ানডেতে তার ৩৫তম সেঞ্চুরি। সবশেষ তিন ম্যাচে এটি তার দ্বিতীয় শতক।
এদিন দ্বিতীয় দ্রুততম ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ১২ হাজার রানের মাইলফলকও স্পর্শ করেন রোহিত।
অন্য প্রান্তে যেন আরো বড় কিছুর অপেক্ষায় ছিলেন শুবমান গিল। ১৩৩ বলে আটটি ছক্কা ও ২৬টি চারে ২২৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন ভারত অধিনায়ক।
এই ইনিংসের পথে একাধিক রেকর্ড গড়েন গিল। ওয়ানডেতে দ্রুততম দ্বিশতকের রেকর্ড এখন তার। ১১৭ বলে দুইশ স্পর্শ করে তিনি পেছনে ফেলেছেন আরেক ভারতীয় ইশান কিষানকে। ২০২২ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১২৬ বলে দ্বিশতক করেছিলেন কিষান।
রান তাড়ায় দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডেতে দ্বিশতক করলেন গিল। গত বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে চোট নিয়ে ২০১ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। তাকে ছাড়িয়ে রান তাড়ায় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড এখন গিলের।
এটি গিলের দ্বিতীয় ওয়ানডে দ্বিশতক। ২০২৩ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০৮ রান করেছিলেন তিনি। ওয়ানডে ইতিহাসে একাধিক দ্বিশতক করা দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান গিল। তিনটি দ্বিশতক নিয়ে এই তালিকায় সবার ওপরে রোহিত শার্মা।
টেস্টেও দ্বিশতক রয়েছে গিলের। অধিনায়ক হিসেবে টেস্ট ও ওয়ানডে - দুই সংস্করণেই দ্বিশতক করা ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার তিনি।
সব মিলিয়ে ম্যাচটিতে তিন অঙ্কের ইনিংস এসেছে পাঁচ ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে। ওয়ানডে ইতিহাসে এক ম্যাচে পাঁচটি সেঞ্চুরির ঘটনা এবারই প্রথম। এর আগে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ চারটি সেঞ্চুরি হয়েছিল তিনবার।
ব্যাটিংয়ের জন্য আদর্শ উইকেটে পঞ্চম ওভারে কেসি কার্টিকে হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেই ধাক্কা সামলে ১১০ রানের জুটি গড়েন ক্যাম্পবেল ও হোপ। জুটিতে সিংহভাগ রান আসে ক্যাম্পবেলের ব্যাট থেকে।
শুরুতে কিছুটা মন্থর থাকলেও সপ্তম ওভারে এক ছক্কা ও তিন চারে ২২ রান নিয়ে গতি বাড়ান ক্যাম্পবেল। ২৯ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি। পাওয়ার প্লের পর রানের গতি কিছুটা কমলেও ৬৫ বলে তিন অঙ্ক স্পর্শ করেন এই ওপেনার। ওয়ানডেতে এটি তার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি।
সাড়ে সাত বছর পর ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করা ক্যাম্পবেল পরের ওভারেই ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। তখন অন্য প্রান্তে হোপের রান ৩২ বলে ২৬।
পরে ৪৯ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন হোপ। পরের ৫০ রান করতে তার লাগে ৪১ বল। ৯০ বলে ক্যারিয়ারের ২০তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি পূর্ণ করার কিছুক্ষণ পরই বিদায় নেন তিনি। ভাঙে জাঙ্গুর সঙ্গে তার ১৮২ রানের জুটি।
জাঙ্গু তখন ৯৯ রানে। পরের ওভারে সিঙ্গল নিয়ে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। পরের বলেই রান আউট হন শেরফেইন রাদারফোর্ড। সেঞ্চুরির পর রাভিন্দ্রা জাদেজার বলে সহজ ক্যাচ দিয়ে ফেরেন জাঙ্গু। শেষ দিকে কিমো পল ও আলজারি জোসেফ ব্যর্থ হলেও রোস্টন চেইস ও শামার জোসেফের ব্যাটে চারশ পার করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
রান তাড়ায় রোহিতের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে প্রথম ১০ ওভারেই ৯২ রান তোলে ভারত। ৩২ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন রোহিত। গিলও দ্রুত গতি বাড়ান এবং ৩৮ বলে ফিফটি স্পর্শ করেন।
একপর্যায়ে দুই ব্যাটসম্যানের রানই ছিল ৮০। পরে গতি বাড়িয়ে ৬২ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন গিল। ওয়ানডেতে এটি তার ১১তম এবং এই সিরিজে টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি।
৮৪ রানে জীবন পান রোহিত। সীমানায় তার ক্যাচ নিতে পারেননি কেসি কার্টি। এরপর ৭২ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন রোহিত। পরের ওভারেই এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন তিনি। ভাঙে ২৫৫ রানের উদ্বোধনী জুটি।
আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান বিরাট কোহলিও এদিন ছিলেন সাবলীল। জেডেন সিলসের এক ওভারে দুর্দান্ত ছক্কা ও টানা দুটি চার মারেন তিনি। ওই ওভারেই একটি চার ও ছক্কা হাঁকান গিল। আসে ২৫ রান।
তবে ইনিংস বড় করতে পারেননি কোহলি। রাদারফোর্ডের দুর্দান্ত ক্যাচে ২৯ রানে ফেরেন তিনি। ততক্ষণে ভারতের রান তিনশ ছাড়িয়ে গেছে।
বাকি পথ রুতুরাজ গায়কোয়াড়কে নিয়ে পাড়ি দেন গিল। ৩৯তম ওভারের দ্বিতীয় বলে সিঙ্গল নিয়ে দ্বিশতক পূর্ণ করেন ভারত অধিনায়ক। রুতুরাজের সঙ্গে তার অবিচ্ছিন্ন জুটিতে আসে ৮৬ রান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ৫০ ওভারে ৪০৫/৭ (ক্যাম্পবেল ১০১, কার্টি ৯, হোপ ১০৪, জাঙ্গু ১১৪, রাদারফোর্ড ০, চেইস ২৯ অপরাজিত, পল ৩, আলজারি ৮, শামার ১৪ অপরাজিত; প্রাসিধ ৫-০-৪৫-১, নাবি ৮.৫-০-৮৪-০, গুরনুর ১০-০-৯৬-২, নামান ৬.২-০-৩৮-০, জাদেজা ১০-০-৭৫-২, কুলদিপ ১০-০-৬৫-২)
ভারত: ৪৩ ওভারে ৪০৬/২ (রোহিত ১০১, গিল ২২৩ অপরাজিত, কোহলি ২৯, রুতুরাজ ৩১ অপরাজিত; সিলস ৮-০-৭৮-১, আলজারি ৮-০-৮৯-০, শামার ৬-০-৫২-১, পল ৩-০-৪৯-০, চেইস ৮.৩-০-৬৩-০, লজ ১০-০-৭৩-০)
ফল: ভারত ৮ উইকেটে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: শুবমান গিল
সিরিজ: ৩ ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ভারত
সানা/আপ্র/০১/১০/২০২৬