স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ দিয়ে শুরু। এরপর একের পর এক গুরুতর অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে মনিরুজ্জামান মাতুব্বর ওরফে মনির হোসেন ওরফে হৃদয় মাতুব্বরের বিরুদ্ধে। ১২ বছর আগে স্ত্রী রাহেলা বেগমকে হত্যার পর পালিয়ে যান তিনি। ওই মামলায় চার বছর কারাভোগ করে ২০১৮ সালে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার গা ঢাকা দেন। এরপর ঢাকার আশুলিয়ায় বসতি গড়ে তাঁর বিরুদ্ধে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যাসহ আরো গুরুতর অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে।
সর্বশেষ আশুলিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারী নাজমা বেগম, তাঁর স্বামী আলমগীর কবির ও নাজমার গর্ভের সন্তান হত্যার ঘটনায় মনিরুজ্জামানের নাম উঠে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে। গ্রেফতারের পর এ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। বর্তমানে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
স্ত্রী হত্যার অভিযোগ: মনিরুজ্জামানের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার দামদরদি গ্রামে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। পারিবারিক সূত্রের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই তিনি উগ্র ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিলেন। বিয়ের পরও তাঁর আচরণে পরিবর্তন আসেনি।
পুলিশ জানায়, ২০১৪ সালে নগরকান্দায় নিজের স্ত্রী রাহেলা বেগমকে হত্যার অভিযোগ ওঠে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই ঘুমন্ত স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে তিনি পালিয়ে যান। পরে ঢাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নগরকান্দা থানায় হত্যা মামলা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরকান্দা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস বলেন, মনির বখাটে প্রকৃতির ছিলেন এবং কারণে-অকারণে প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতেন। পরিবার তাঁকে বিয়ে করিয়েছিল সংসারে মনোযোগী করার আশায়। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্ত্রী হত্যা মামলায় চার বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্ত হন মনিরুজ্জামান। কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর আবার পালিয়ে যান। মামলায় হাজিরা না দেওয়ায় পরে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।
আশুলিয়ায় জোড়া হত্যার তদন্তে নাম: জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মনিরুজ্জামান ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় গা ঢাকা দেন। সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে আরো গুরুতর অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে মধ্য আশুলিয়ার জামগড়ার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে পুলিশ অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম (৩৯) ও তাঁর স্বামী আলমগীর কবিরের (৪৫) মরদেহ উদ্ধার করে। নাজমার মরদেহ খাটের ওপর পড়ে ছিল। তাঁর গর্ভের সন্তানও মারা যায়। একই কক্ষে আলমগীরের মরদেহ গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
নাজমা তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। ঘটনার সময় আলমগীর বেকার ছিলেন। আগে তিনি ফেরি করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতেন। তাঁদের দুজনের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায়।
নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার নেয় পিবিআই ঢাকা জেলা। তদন্ত করেন উপপরিদর্শক আনিসুর রহমান।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের শুরুতে কোনো সূত্র ছিল না। পরে গুপ্তচর নিয়োগ করে মনিরুজ্জামানকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আলমগীর ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নাজমার পার্স, সিমসহ মুঠোফোন ও পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়।
দাওয়াত দিয়ে ডেকে নেওয়া হয়েছিল: পিবিআই ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামসুল আরেফিন বলেন, স্ত্রী হত্যা মামলায় জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মনিরুজ্জামান আশুলিয়ায় গা ঢাকা দেন। সেখানে আলমগীরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। মনিরুজ্জামান সবজির ব্যবসা করতেন এবং তাঁদের বাসা ছিল কাছাকাছি।
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, নাজমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আগে থেকেই তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন মনিরুজ্জামান। বিষয়টি জানতে পেরে আলমগীরের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর মনিরুজ্জামানকে দাওয়াত দিয়ে নিজেদের বাসায় ডেকে নেন আলমগীর ও নাজমা। সেখানে নাজমার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় নিয়ে আলমগীরের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় নাজমা ঝাঁটা দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করেন। মনিরুজ্জামান তাঁর পেটে লাথি মারলে তিনি খাটের ওপর পড়ে যান। পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, আঘাতের ফলে নাজমার গর্ভের সন্তান বেরিয়ে যায় এবং দুজনই মারা যান।
এরপর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করেন। একপর্যায়ে মনিরুজ্জামান আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে পিবিআই জানিয়েছে। পরে তাঁর মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। নাজমার ব্যবহৃত মুঠোফোন, সিমকার্ড, পরিচয়পত্র ও পার্স নিয়ে নিজের বাসায় চলে যান মনিরুজ্জামান। এ ঘটনায় তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
আরো একটি ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ: পিবিআই কর্মকর্তা শামসুল আরেফিন বলেন, তদন্তে ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বরের আরেকটি ঘটনায়ও মনিরুজ্জামানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ওই ঘটনায় মনিরুজ্জামান ও তাঁর দুই সহযোগী এক নারীকে ধরে আশুলিয়ার নয়ানগরের একটি জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করেন এবং পরে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে মনিরুজ্জামান ওই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় করা মামলায় গ্রেফতারের আট মাস পর জামিনে মুক্ত হন তিনি। দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি চলার মধ্যেই পরে জামগড়ার ওই বাসায় ঢুকে আলমগীর, নাজমা ও নাজমার গর্ভের সন্তানকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
পরিবারও সম্পর্ক ছিন্ন করেছে: মনিরুজ্জামানের বড় বোন তাসলিমা বেগম বলেন, তাঁর ভাই উগ্র ও অবাধ্য স্বভাবের ছিলেন। তাঁর আচরণে মা-বাবা ও পরিবারের সদস্যরা সব সময় অসন্তুষ্ট ছিলেন। প্রায় ৪০ দিন আগে সন্তানের আচরণে কষ্ট নিয়ে তাঁদের বাবা জব্বার মাতুব্বর মারা গেছেন। তাঁদের মা এখন অসুস্থ।
তাসলিমা বেগম জানান, মনিরুজ্জামানের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। স্ত্রী হত্যা মামলায় কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর তিনি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতেন না। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। পরে ফরিদপুরের নগরকান্দা ছেড়ে চলে যান তিনি।
তাসলিমা বেগম বলেন, মনিরুজ্জামান যে অপরাধ করেছেন, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও পরিবারের কোনো আপত্তি বা আক্ষেপ নেই। তাঁর প্রথম স্ত্রীর সংসারে একটি মেয়ে রয়েছে। বর্তমানে মেয়েটির পড়াশোনার দায়িত্ব তাঁর মা পালন করছেন।
পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, স্ত্রী হত্যার অভিযোগ দিয়ে শুরু করে পরবর্তী সময়ে একের পর এক গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ আশুলিয়ায় আলমগীর, তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমা এবং নাজমার গর্ভের সন্তান হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে তিনি এখন কারাগারে রয়েছেন।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৭/১০/২০২৬