প্রথম ম্যাচে তিউনিসিয়ার জালে পাঁচবার বল পাঠিয়ে যেন বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের আগমনী বার্তা জোরালোভাবে ঘোষণা করেছিল সুইডেন। আক্রমণের ধার, গোলের ক্ষুধা আর আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে তাদের নিয়ে শুরু হয়েছিল বড় স্বপ্নের আলোচনা। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই, এক ম্যাচের উচ্ছ্বাসই আরেক ম্যাচে হয়ে ওঠে কঠিন বাস্তবতার আঘাত।
হিউস্টনের গ্যালারিভরা স্টেডিয়ামে সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো সুইডেনকেই। আর প্রতিপক্ষ যখন নেদারল্যান্ডস—রোনাল্ড কুমানের শাণিত ও শৃঙ্খলিত দল—তখন ভুলের সুযোগ ছিল না একটুও। ফলাফলও হলো নির্মম, ৫-১ গোলের একতরফা জয় নিয়ে সুইডেনকে কার্যত ভাসিয়ে দিল ডাচরা।
ম্যাচ শুরু হতেই যেন স্ক্রিপ্ট লিখে নিলো নেদারল্যান্ডস। আক্রমণের প্রথম ঢেউতেই সুইডিশ রক্ষণে ফাটল ধরিয়ে দেয় তারা। পঞ্চম মিনিটে কোডি গাকপোর নিখুঁত ক্রস থেকে ব্রায়ান ব্রবি যে শটটি নিলেন, তা ছিল আত্মবিশ্বাসের নিখাদ প্রকাশ। বল জালে জড়াতেই হিউস্টনের বাতাসে ভেসে উঠল ডাচদের আধিপত্যের ইঙ্গিত।
এরপর সময় বেশি নিল না তারা। ১৭তম মিনিটে আবারও ব্রবি—ডেনজেল ডামফ্রিসের দৌড়ানো ক্রস, আর এক স্লাইডিং ফিনিশ। সুইডেন যেন তখনই বুঝে গেল, রাতটি সহজ হবে না।
তবুও তারা হার মানেনি তৎক্ষণাৎ। মাঝেমধ্যে আক্রমণে উঠে এসেছে, শট নিয়েছে, চেষ্টা করেছে ম্যাচে ফিরতে। কিন্তু প্রতিবারই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক দৃঢ় প্রাচীর—নেদারল্যান্ডসের গোলরক্ষক বার্ট ভেরব্রুগেন। তার হাত, পা আর প্রতিক্রিয়া যেন সুইডেনের প্রত্যাবর্তনের সব দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিল।
প্রথমার্ধে সুইডেন একবার বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে উৎসব শুরু হয়নি। উল্টো বিরতির ঠিক আগে তাদের একের পর এক আক্রমণ ফিরিয়ে দিয়ে ডাচরা জানিয়ে দেয়—এ ম্যাচে দয়া নেই।
বিরতির পর দৃশ্যপট আরো নির্মম। ৪৭ মিনিটে গাকপো, আবারও ডামফ্রিসের তৈরি সুযোগে, দূরের পোস্টে ঠাণ্ডা মাথার ফিনিশিংয়ে ম্যাচকে প্রায় একপেশে করে ফেলেন। সাত মিনিট পর আবার গাকপো—এবার নিজের দক্ষতা আর সামারভিলের তৈরি করা সুযোগ মিলিয়ে গোল, আর স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-০।
সুইডেন তখনও শুধু নামেই ম্যাচে ছিল, বাস্তবে নয়।
তবু হাল না ছেড়ে এক ঝলক আলো জ্বালান অ্যান্থনি এলাঙ্গা। ৫৯ মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে তার নিখুঁত ফিনিশিং কিছুটা হলেও প্রাণ ফেরায় সুইডিশ শিবিরে। কিন্তু সেটি ছিল কেবল ক্ষণিকের স্বস্তি—ঝড় থামার আগে শেষ নিঃশ্বাস।
কারণ শেষ হাসি ছিল আবারও ডাচদের। ম্যাচের শেষ দিকে বদলি হিসেবে নেমে ক্রিসেনসিও সামারভিল মেমফিস ডিপাইয়ের পাসে বল জালে পাঠিয়ে পূর্ণ করেন গোল-পাঁচের গল্প। যে গল্প শুরু হয়েছিল সুইডেনের দাপটে, শেষ হলো তাদেরই বিধ্বস্ত হয়ে।
পরিসংখ্যান বলছে, সুইডেন সুযোগ তৈরি করেছে, শট নিয়েছে, লড়েছে। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—লড়াই নয়, গোলই ইতিহাস লেখে। আর সেই ইতিহাস লিখেছে নেদারল্যান্ডস, একদম শীতল দক্ষতায়, একদম নির্দয় সৌন্দর্যে।
ফলে এক ম্যাচের ব্যবধানে বিশ্বকাপের ছবিটাই বদলে গেল। যে সুইডেন প্রথম ম্যাচে পাঁচ গোলের উল্লাসে ভেসেছিল, দ্বিতীয় ম্যাচে তারা নিজেরাই ডুবে গেল একই সংখ্যার গোলের স্রোতে।
আর নেদারল্যান্ডস? তারা শুধু জয় পেল না—নকআউটের দরজায় এক পা রেখেই জানিয়ে দিল, কমলা ঝড় এখনো থামেনি।
সানা/আপ্র/২১/৬/২০২৬