গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

এআইয়ের অপব্যবহারে মিথ্যা, প্রতারণা বহুগুণ শক্তিশালী করেছে

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৩৯ পিএম, ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:২৫ এএম ২০২৬
এআইয়ের অপব্যবহারে মিথ্যা, প্রতারণা বহুগুণ শক্তিশালী করেছে
ছবি

ছবি সংগৃহীত

এক সময় মানুষ বলত, চোখে দেখা জিনিসই আসল বিশ্বাস। ছবিকে ধরা হতো ঘটনার সাক্ষী হিসেবে, কণ্ঠস্বরকে ব্যক্তির পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে, ভিডিওকে বাস্তবতার দৃশ্যমান দলিল হিসেবে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ ওই পুরোনো নিশ্চয়তাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এখন চোখের সামনে দেখা ছবি সত্য নাও হতে পারে, কানে শোনা কণ্ঠস্বর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাও হতে পারে, ভিডিওতে দেখা ঘটনাও বাস্তবে ঘটেনি। এ ছাড়া কোনো মানুষের মুখ ও কণ্ঠ ব্যবহার করে এমন বক্তব্যও তৈরি করা সম্ভব- যা তিনি কখনো বলেননি। এআই এমন একটি প্রযুক্তিগত ক্ষমতা তৈরি করেছে- যার অপব্যবহার মানুষের বহু পুরোনো মিথ্যা, প্রতারণা ও প্রচারণাকে আগের তুলনায় বহুগুণ শক্তিশালী করে তুলছে। এ বিষয় নিয়েই এবারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতার প্রধান ফিচার

মিথ্যা যখন সত্যের মতো দেখতে মনে হচ্ছে, তখন মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে? এআই কি অবিশ্বাসের যুগ শুরু করে দিয়েছে? উত্তরটি সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। এআই নিজে অবিশ্বাসের যুগের জন্য দায়ী নয়। ফলে সংকটটি প্রযুক্তির চেয়ে বেশি বিশ্বাসের সংকট। আজকাল ছবির ওপরও মানুষের বিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে। একটি ছবি দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবতার শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, রাজনৈতিক সমাবেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি- ছবির মাধ্যমে আমরা তার দৃশ্যমান প্রমাণ পেতাম। এআই উৎপাদিত ছবি ও ভিডিও সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। আলো-ছায়া, মুখাবয়ব, পোশাক, পরিবেশ- সবকিছু এমনভাবে সাজানো যায় যে সাধারণ দর্শকের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে- ছবিটি বাস্তব, নাকি কৃত্রিম। ফলে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আগে সমস্যা ছিল মিথ্যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করা। এখন নতুন সমস্যা হচ্ছে, সত্যকেও মিথ্যা বলে অস্বীকার করা। এটি আরও ভয়ঙ্কর। কারণ কোনো ভুয়া ছবি ছড়িয়ে একজন নিরপরাধ মানুষকে অভিযুক্ত করা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি কোনো সত্যিকারের ছবি দেখিয়ে বলা, ‘এটিও তো এআই দিয়ে বানানো’- এমন প্রবণতাও সমাজের সত্য যাচাইয়ের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।

নকল ভিডিও আছে। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেনি। ভিডিওকে একসময় ছবির চেয়েও শক্তিশালী প্রমাণ মনে করা হতো। কারণ ভিডিওতে ঘটনা চলমান অবস্থায় দেখা যায়। কিন্তু জেনারেটিভ এআই সেই নিশ্চয়তাকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। একজন রাজনৈতিক নেতা এমন কথা বলেছেন- এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা তিনি কখনো বলেননি। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তার কণ্ঠস্বর নকল করে বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব। কোনো পরিচিত ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে দেখানো সম্ভব- যেখানে তিনি কখনো ছিলেনই না। এ ধরনের কনটেন্টকে সাধারণভাবে ডিপফেক বা সিনথেটিক মিডিয়ার বিস্তৃত পরিসরের মধ্যে দেখা হয়। এখানে বিপদের মাত্রা বোঝার জন্য একটি সাধারণ উদাহরণ যথেষ্ট।

ধরা যাক, নির্বাচনের আগের রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল। সেখানে একজন প্রার্থীকে একটি আপত্তিকর বক্তব্য দিতে দেখা যাচ্ছে। ভিডিওটি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। পরে প্রমাণ হলো, ভিডিওটি কৃত্রিম। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। এআইয়ের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র হলো অবিশ্বাস তৈরি করা। মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রচলিত ধারণা ছিল, মিথ্যা শনাক্ত করে মানুষকে সত্য জানানো। কিন্তু এআই যুগে আরেকটি বিপজ্জনক কৌশল দেখা দিতে পারে- সত্য-মিথ্যা উভয়কেই সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়া। একজন রাজনীতিকের বিরুদ্ধে সত্যিকারের কোনো ভিডিও প্রকাশিত হলো। তিনি দাবি করলেন, ‘এটি এআই দিয়ে তৈরি।’

কোনো কর্মকর্তার দুর্নীতির প্রকৃত অডিও প্রকাশিত হলো। বলা হলো, ‘কণ্ঠস্বর নকল করা হয়েছে।’ কোনো নির্যাতনের সত্যিকারের ছবি প্রকাশিত হলো। পাল্টা বলা হলো, ‘এটি এআই-জেনারেটেড।’ অর্থাৎ ভবিষ্যতের প্রতারককে সবসময় নিখুঁত মিথ্যা বানাতেও হবে না। কখনো কখনো শুধু সত্যকে সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেওয়াই যথেষ্ট। এ কারণেই এআইয়ের যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়তো তথ্য নয়, তা হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা। এতে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকি রয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে ভোটারের সিদ্ধান্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে। সেই তথ্য যদি পরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা যায়, তাহলে নির্বাচনের পরিবেশও প্রভাবিত হতে পারে। একজন প্রার্থীকে নিয়ে মিথ্যা বক্তব্য, ভুয়া ভিডিও, নকল ছবি, কৃত্রিম অডিও কিংবা সমন্বিত গুজব- এসব ভোটারের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে; বিশেষ করে নির্বাচনের ঠিক আগে কোনো ভুয়া কনটেন্ট ভাইরাল হলে সত্য সংশোধনের সময় খুব কম থাকে। ফলে এআই যুগের নির্বাচনী নিরাপত্তা শুধু ব্যালট বাক্স বা ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; তথ্যপরিবেশের নিরাপত্তাও গণতন্ত্রের নিরাপত্তার অংশ।

আজকাল ব্যক্তিমানুষের সম্মান কোথায়? এআইয়ের আরেকটি ভয়ংকর দিক ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত। কারও মুখ ব্যবহার করে ভুয়া ছবি তৈরি করা, কারও কণ্ঠস্বর নকল করা, কাউকে এমন বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করা, যা তিনি দেননি- এসব একজন মানুষের সামাজিক পরিচয়, কর্মজীবন ও সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে; বিশেষ করে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী এবং জনপরিচিত ব্যক্তিরা এর ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। একটি মিথ্যা ছবি কয়েক ঘণ্টায় লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু সেটি মুছে ফেলার পরও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায় না। এখানে তাই প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, এটা মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্ন। এ জন্য বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

বাংলাদেশেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ব্যাপক। ফলে এআই-উৎপাদিত ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও ও গুজবের সম্ভাব্য প্রভাবকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি ব্যাপক ডিজিটাল ও মিডিয়া লিটারেসি। বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে- কীভাবে ভুয়া ছবি শনাক্ত করতে হয়, কীভাবে তথ্যের উৎস যাচাই করতে হয়, কীভাবে ভাইরাল ভিডিওর পুরোনো বা ভিন্ন প্রেক্ষাপট শনাক্ত করতে হয়, কখন কোনো তথ্য শেয়ার করা উচিত নয় এবং এআই উৎপাদিত কনটেন্ট সম্পর্কে কীভাবে সতর্ক থাকতে হয়। তাহলে কি আমরা অবিশ্বাসের যুগে ঢুকে পড়েছি? আংশিকভাবে, হ্যাঁ। তবে এটি অবশ্যম্ভাবী নয়।

এআই আমাদের বিশ্বাসের পুরোনো ভিত্তিগুলোকে দুর্বল করেছে। কিন্তু নতুন ভিত্তি তৈরি করার সুযোগও দিয়েছে। ইতোমধ্যে এআই ও জ্যাকবের ২০৩০ সালের মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা নিয়ে কথা শুরু হয়েছে। ২০৩০ সালকে ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে মানুষের কৌতূহল যেমন বাড়ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে ভয়ও। যেখানে দাবি করা হয়, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, জলবায়ু বিপর্যয়, যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার মানবসভ্যতাকে ভয়াবহ সংকটে ফেলতে পারে। তবে এসব ভবিষ্যদ্বাণীকে বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই।

বাস্তব আশঙ্কা অবশ্য অন্য জায়গায়। এআই ইতিমধ্যে তথ্য, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামরিক প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিকে বদলে দিচ্ছে। ভুল তথ্য ও ডিপফেক যদি সত্যের মতো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সমাজে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, ব্যাপক নজরদারি কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট অ্যালগরিদমও মানবাধিকারের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই ২০৩০-এর ‘মহাপ্রলয়’ আসবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, মানুষ কি এআইকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে পারবে? প্রযুক্তি নিজে ধ্বংসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; মানুষের নীতি, নিয়ন্ত্রণ, নৈতিকতা ও ব্যবহারের ওপরই অনেকটাই নির্ভর করে ভবিষ্যৎ।

যুদ্ধ, পরিবেশ ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, সম্পদের বৈষম্য, মিথ্যা তথ্য এবং মানুষের হাতে প্রযুক্তির বিপজ্জনক ব্যবহার সভ্যতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এআই সেই ঝুঁকিকে আরও তীব্র করতে পারে। বিশেষত যখন মানুষ নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ বিসর্জন দিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এআইকে নিষিদ্ধ করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এআইয়ের ভালো ব্যবহারকে উৎসাহিত করে এবং অপব্যবহার মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়িয়ে এগোতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো মানুষের সচেতনতা। মানবসভ্যতার সামনে তাই নতুন নৈতিক দায়িত্ব তৈরি হয়েছে। আর কোনো সভ্যতার জন্য এর চেয়ে বড় সংকট খুব কমই আছে। মিথ্যা যখন সত্যের মতো দেখতে হয়, তখন সত্যকে রক্ষা করার শেষ দুর্গটি প্রযুক্তি নয়, মানুষের বিচারবোধ।

কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন বাংলাদেশি রেদোয়ান
০৪ অক্টোবর ২০২৬

মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন বাংলাদেশি রেদোয়ান

পৃথিবী থেকে এক হাজার আলোকবর্ষেরও বেশি দূরে একটি অস্বাভাবিক মহাজাগতিক বস্তুর সন্ধান পেয়েছেন এক বাংলাদ...

মহাকাশে গুগল প্রথমবার পাঠাল ফ্রিজ আকারে এআই চিপ
০৪ অক্টোবর ২০২৬

মহাকাশে গুগল প্রথমবার পাঠাল ফ্রিজ আকারে এআই চিপ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির চিপ এবার প্রথমবারের মতো মহাকাশে পাঠিয়েছে গুগল। যুক্তরাষ্ট্রের ক...

সিঙ্গাপুরে জন্মহার বৃদ্ধিতে সরকারি কর্মীদের ডেটিং অ্যাপ চালু
০৪ অক্টোবর ২০২৬

সিঙ্গাপুরে জন্মহার বৃদ্ধিতে সরকারি কর্মীদের ডেটিং অ্যাপ চালু

রেকর্ড পরিমাণ কম জন্মহারের কারণে সৃষ্ট জনসংখ্যা সংকটের মধ্যে সিঙ্গাপুর সরকার দেশটির সরকারি চাকরিজীবী...

গণতন্ত্রের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ক্ষতিকর
০৪ অক্টোবর ২০২৬

গণতন্ত্রের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ক্ষতিকর

গণতন্ত্রের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বড় হুমকি হয়ে উঠছে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর মানুষের মধ্যে এই...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আদালতে হেলমেট ছুড়ে আখতারুজ্জামান বললেন, কেন পরব

রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে নেওয়ার সময় মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক আপনি কি মনে করেন তিনি সঠিক প্রশ্ন করেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে