রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই। সবজির অস্বাভাবিক দাম, সয়াবিন তেল ও চিনির সরবরাহ সংকট, ডিমের বাড়তি মূল্য এবং পেঁয়াজের নতুন করে দাম বাড়ায় চাপে পড়েছেন ক্রেতারা। নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তেল-চিনি কিনতে হচ্ছে অনেককে। এক থেকে দুই দিনের ব্যবধানে কোনো কোনো সবজির কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ৪০ টাকা। পটল, বেগুন, শিম ও কাঁচা মরিচের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির দামও ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বোতলজাত সয়াবিন তেল ও প্যাকেটজাত চিনি কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও বেশি দাম দিয়েও কিনতে হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের একাংশ বলছেন, তেল বিক্রি করে লাভ কম হওয়ায় তাঁরা পণ্যটি দোকানে রাখছেন না। সব মিলিয়ে বাজারে একদিকে সরবরাহের ঘাটতি, অন্যদিকে বাড়তি দাম- দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউনহল বাজার, মেরাদিয়া, রামপুরা, খিলগাঁও, হাজীপাড়া, মালিবাগ ও সেগুনবাগিচাসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সবজির দামে ক্রেতার মাথায় হাত
রাজধানীর মেরাদিয়া বাজারে শুক্রবার সকালে প্রতি কেজি পটল বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকায়। অথচ বুধবার ও বৃহস্পতিবারও এর দাম ছিল ৮০ টাকা। আলু প্রকারভেদে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, পটল ও করলা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা এবং ফুলকপি প্রতি পিস ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রতি কেজি ঝিঙা ১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ১০০ টাকা, শিম ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, কচু ৮০ টাকা, পেঁপে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ১০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ২০০ টাকা এবং বরবটি ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুনের দাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
সবজির পাশাপাশি মাছের দামও চড়া। তাজা রুই মাছের কেজি ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা। তবে মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, কক মুরগি ৩৩০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি ৩৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৮২০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা।
বাজার করতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ক্রেতা আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, আগের দিনও পটল ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি ছিল। অথচ এখন ১২০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। আগে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে পেঁপে কিনলেও এখন দিতে হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। ৫০ থেকে ৬০ টাকার লাউও এখন ৮০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
তাঁর প্রশ্ন, “আমরা যাব কোথায়? কার কাছে বলবো দাম কমান?”
আরেক ক্রেতা মানিক মিয়া বলেন, দিন যত যাচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম ততই বাড়ছে। সবজি, মাছ ও মাংস- কোনো কিছুর দামই কম নয়। এক কেজি গরুর মাংস কিনতেই অনেক টাকা চলে যায়। এরপর অন্য বাজার কীভাবে করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।
ক্রেতা সেলিম মিয়ার কণ্ঠে আরো বেশি হতাশা। তিনি বলেন, আগে যে পরিমাণ পণ্য কিনতেন, এখন তার অর্ধেক কিনতে হয়। তাঁদের কথা শোনার কেউ নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “আগে যা কিনতাম, এখন তার অর্ধেক কিনি। আর বুকে পাথর বেঁধে সবকিছু সহ্য করে যাই।”
তেল-চিনি কিনতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা
নিত্যপণ্যের বাজারে সয়াবিন তেল ও চিনির দামেও স্বস্তি নেই। বাজারে এক কেজি প্যাকেটজাত চিনির গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে ১১০ টাকা। কিন্তু দোকানভেদে তা বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে কিনতে হওয়ায় নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে খরচ পোষানো যায় না। এ কারণে কিছু দোকানি প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি না করে প্যাকেট খুলে খোলা চিনি হিসেবে বিক্রি করছেন।
একই পরিস্থিতি সয়াবিন তেলের বাজারেও। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ২০৪ টাকা হলেও অনেক দোকানে তা ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও সরবরাহ কম থাকায় বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু দোকানে তেল থাকলেও তা ক্রেতাদের সামনে রাখা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বাজারে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ২২০ টাকা এবং পাম তেল ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতাদের একাংশের অভিযোগ, কয়েক সপ্তাহ ধরে কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে রেখেছে। তবে তেল বিক্রিতে তাঁদের অনাগ্রহের আরেকটি কারণ হলো কম মুনাফা। আগে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রিতে খুচরা বিক্রেতারা তিন থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত লাভ করতেন। এখন সেই লাভ কমে লিটারপ্রতি মাত্র এক টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
মাহিন জেনারেল স্টোরের রাজিব হোসেন বলেন, পাঁচ লিটার তেলের দাম ১ হাজার ২০ টাকা। এই তেল বিক্রি করে লাভ হয় মাত্র পাঁচ টাকা। এত টাকা বিনিয়োগ করে অন্য পণ্য বিক্রি করলে কয়েক গুণ বেশি লাভ পাওয়া যায়। তার ওপর কোম্পানিগুলো ঠিকমতো তেল সরবরাহ করে না। এ কারণে তিনি তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
শহীদ স্টোরের এক বিক্রেতারও অভিযোগ, কোম্পানিগুলো খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অসহযোগিতা করছে। তাই তাঁরাও তেল দোকানে রাখছেন না।
পেঁয়াজ ও ডিমেও বাড়তি খরচ
নিত্যপ্রয়োজনীয় পেঁয়াজের দামও নতুন করে বেড়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়ে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়।
ডিমের বাজারেও স্বস্তি নেই। বিভিন্ন বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা। সে হিসাবে এক ডজন ডিমের দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৬৫ টাকা।
স্বল্প আয়ের পরিবারের কাছে ডিম তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়তি দামে ডিম কিনতে হওয়ায় তাঁদের খাদ্যব্যয় বেড়েছে।
আটা-ময়দার দামও বাড়তি
সবজি, তেল, চিনি, পেঁয়াজ ও ডিমের পাশাপাশি আটা-ময়দার দামও ক্রেতাদের চাপে ফেলছে। বাজারে প্রতি কেজি আটা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায়। কোম্পানিভেদে ময়দার দাম কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকার বেশি। ক্রেতাদের ভাষ্য, দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগের তুলনায় এসব পণ্যের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেশি।
ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সবজির বাজারে সামগ্রিক স্বস্তি ফেরেনি। কয়েকটি সবজির দাম আগের তুলনায় কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা কমলেও অধিকাংশ পণ্যের দামই রয়েছে চড়া।
বাজার তদারকির দাবি
নিত্যপণ্যের এমন মূল্যচাপের মধ্যে ক্রেতাদের প্রধান প্রশ্ন- বাজারে সরবরাহ সংকট কেন, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কেন, আর এসব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
সয়াবিন তেল ও চিনির সরবরাহ পরিস্থিতি, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান এবং সবজির আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ তদন্ত এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে শুধু দাম ঘোষণাই যথেষ্ট নয়; সরবরাহব্যবস্থা ও খুচরা বাজারে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সীমিত আয়ের মানুষের খাদ্যতালিকা আরো সংকুচিত হবে, আর সংসারের ব্যয় সামলাতে গিয়ে তাঁদের প্রতিদিনই কম পণ্য কিনে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
সানা/আপ্র/৯/১০/২০২৬