দেশজুড়ে শুরু হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা-প্রায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে এটি শুধু একটি পরীক্ষা নয়, বরং এক অস্থির সময়ের প্রজন্মের সক্ষমতার পরিমাপ। নতুন সরকারের অধীনে প্রথম এই পাবলিক পরীক্ষা ঘিরে প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও কঠোরতা দৃশ্যমান হলেও, প্রশ্ন থেকে যায়-এই আয়োজন কতটা শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, আর কতটা কাঠামোগত সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে সক্ষম?
এই পরীক্ষার্থীরা এক ব্যতিক্রমী সময়ের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে। বৈশ্বিক মহামারি করোনার কারণে তাদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ, অনলাইন শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে শিক্ষার সমতা ভেঙে যায়। ফলে একটি বড় অংশ মৌলিক দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ে, যার প্রভাব আজকের পরীক্ষার খাতায় প্রতিফলিত হওয়াই স্বাভাবিক।
এরপর যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শাসন পরিবর্তনের অভিঘাত। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ছাত্র-আন্দোলনের অভিঘাতে শিক্ষাঙ্গনে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও পড়াশোনার ধারাবাহিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নতুন সৃজনশীল শিক্ষাক্রমও যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া বাস্তবায়নের ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ই বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রীর কেন্দ্র পরিদর্শনে “সুন্দর পরিবেশে পরীক্ষা” হওয়ার চিত্র আশাব্যঞ্জক হলেও, বাস্তবতার গভীরতর স্তর ভিন্ন কথা বলে। একটি কেন্দ্রে অনিয়ম ধরা পড়া কিংবা প্রশ্নফাঁস না হওয়ার নিশ্চয়তা প্রশাসনিক সফলতা নির্দেশ করে বটে, কিন্তু তা শিক্ষার মানোন্নয়নের পূর্ণ প্রতিফলন নয়। পরীক্ষাকেন্দ্রে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা সহজ; কিন্তু শিক্ষার্থীর মনে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করা অনেক বেশি কঠিন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান, পরীক্ষায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নজরদারি এবং ভবিষ্যতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ-এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু নিয়ম-কানুন, নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একটি দীর্ঘদিনের অবক্ষয়গ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়। “পচা মাছ দিয়ে সুস্বাদু তরকারি রান্না” করার মতোই এটি একটি অসম্ভব প্রত্যাশা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-আমরা কি শিক্ষাকে পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি? যখন শিক্ষার্থীদের মৌলিক প্রস্তুতি দুর্বল, তখন কঠোর মূল্যায়ন কিংবা নজরদারি তাদের মধ্যে ভয় ও হতাশা বাড়াতে পারে। অথচ সরকার নিজেই পরীক্ষাভীতি দূর করে আনন্দময় পরিবেশ তৈরির কথা বলছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে।
বাস্তবতা হলো, আগে প্রয়োজন শিক্ষার ভিত মজবুত করা। যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়ন, শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন, পাঠদানে সৃজনশীলতা ও মানবিকতা নিশ্চিত করা-এসব ছাড়া কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক সংস্কার টেকসই হবে না। শিক্ষার্থীরা যদি যথাযথভাবে প্রস্তুত হয়, তবে সিসি ক্যামেরা কিংবা অতিরিক্ত নজরদারির প্রয়োজন নিজেই কমে যাবে।
এই মুহূর্তে নীতিনির্ধারকদের উচিত শিক্ষাকে একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা-যেখানে পরীক্ষা কেবল একটি ধাপ, লক্ষ্য নয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক শক্তি, আত্মবিশ্বাস ও শেখার আনন্দকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায়, আমরা কেবল ভালো পরীক্ষার আয়োজন করব, কিন্তু ভালো শিক্ষার্থী তৈরি করতে ব্যর্থ হবো।
অতএব, সময়ের দাবি খুব স্পষ্ট- নির্দেশনা নয়, প্রয়োজন দূরদর্শী সংস্কার; কঠোরতা নয়, প্রয়োজন সহানুভূতিশীল নেতৃত্ব। শিক্ষার ভবিষ্যৎ গড়তে হলে পরীক্ষার হলের বাইরেই শুরু করতে হবে প্রকৃত পরিবর্তনের যাত্রা।
সানা/আপ্র/২২/৪/২০২৬