চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শুরু হচ্ছে। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেবেন। দেশজুড়ে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের লিখিত পরীক্ষা ৮ আগস্ট শেষ হবে। ব্যবহারিক পরীক্ষা চলবে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি ভোকেশনালের তত্ত্বীয় পরীক্ষা ২৫ জুলাই, ডিপ্লোমা ইন কমার্সের তত্ত্বীয় পরীক্ষা ২২ জুলাই এবং বিএমটির তত্ত্বীয় পরীক্ষা ১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।
এ বছর নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন, যা গত বছরের তুলনায় ১৪ হাজার ৩১৬ জন বেশি। ৪ হাজার ৮৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ১ হাজার ৬২৬টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেবেন।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন আলিম পরীক্ষায় অংশ নেবেন ৯২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ৬ হাজার ৮০৩ জন। ২ হাজার ৭০৫টি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ৪৬১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবেন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি ভোকেশনাল, ডিপ্লোমা ইন কমার্স ও বিএমটি পরীক্ষায় অংশ নেবেন ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থী। ১ হাজার ৮৪৯টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৬১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেবেন। গত বছরের তুলনায় এ বোর্ডে পরীক্ষার্থী কমেছে ১ হাজার ৬৪৭ জন।
এবার প্রথমবারের মতো সব শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো সব পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেন্দ্রগুলোকে ক্যামেরার মডেল, ডিভাইসের সিরিয়াল নম্বর, আইডি ও পাসওয়ার্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষার্থীদের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনাও জারি করেছে শিক্ষা বোর্ড। পরীক্ষা শুরুর কমপক্ষে ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রসচিবদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পরে কেউ এলে তার রোল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করে কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
পরীক্ষাকক্ষে ৫ থেকে ৬ ফুট দীর্ঘ বেঞ্চে সর্বোচ্চ দুইজন এবং ৪ ফুট দীর্ঘ বেঞ্চে একজন পরীক্ষার্থীর বসার ব্যবস্থা থাকবে। প্রতি কক্ষে অন্তত দুইজন কক্ষ পরিদর্শক দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন করে কক্ষ পরিদর্শক নিয়োজিত থাকবেন।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার জানান, তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে আসন বিন্যাস, প্রতি ২০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন পরিদর্শক এবং প্রতিটি কক্ষে অন্তত দুইজন পরিদর্শক রাখার নির্দেশনা প্রতি বছরের মতো এবারও বহাল রাখা হয়েছে। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের বাইরে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক বা অন্যদের জটলা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে জনসাধারণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ।
শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, পরীক্ষা চলাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অনুমোদিত পর্যবেক্ষক ছাড়া অন্য কেউ কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করতে পারবেন না। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর কেন্দ্রের টয়লেট তল্লাশি করে নকলের কোনো উপকরণ পাওয়া গেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণ করতে হবে। তবে গত বছরের মতো এবারও পরীক্ষার বিরতির সময় বা ফাঁকা সময়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম চালানোর সুযোগ থাকবে।
কেন্দ্রে নিরাপত্তায় পুলিশের গায়ে থাকবে ক্যামেরা: এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার এবং বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা এবার বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
বুধবার (১ জুলাই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরীক্ষা নিয়ে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানের কথা জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, সাইবার আইন কার্যকর হওয়ায় কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ালে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরীক্ষা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
খাতা পুনর্মূল্যায়নের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘দ্য পাবলিক এক্সামিনেশনস (অফেন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। নতুন আইনের আওতায় ফলাফলে অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থীরা শুধু খাতা পুনর্নিরীক্ষণ নয়, খাতা পুনর্মূল্যায়নেরও সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, সংশোধিত আইনে পরীক্ষাসংক্রান্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কেউ অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। শিক্ষামন্ত্রী জানান, এবার প্রথমবারের মতো দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে এইচএসসির বিভিন্ন তত্ত্বীয় বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। আগামী পরীক্ষা থেকে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অভিন্ন বিষয়গুলোতেও একক প্রশ্নপত্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। পরীক্ষা স্থগিত করার পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এসএসসি পরীক্ষায় বন্যার কারণে কোনো কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থানীয় প্রশাসন যেভাবে বিকল্প স্থানে পরীক্ষা নিয়েছিল, এবারও প্রয়োজন হলে একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরো জানান, যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি বিষয়ের জন্য তিন সেট করে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানান।
সানা/আপ্র/২/৭/২০২৬