ছয় দশকের আক্ষেপ ঘুচিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে দারুণ এক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখল ইংল্যান্ড। ম্যাচের শুরুতেই ডিআর কঙ্গোর কাছে পিছিয়ে পড়েও অধিনায়ক হ্যারি কেইনের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে থ্রি লায়নরা। একই সঙ্গে ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে প্রথমে গোল হজম করার পর আবারও জয়ের স্বাদ পেল ইংলিশরা।
বুধবার (১ জুলাই) আটলান্টার মার্সিডিজ-বেন্জ স্টেডিয়ামে শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল উপহার দেয় বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো নকআউটে ওঠা ডিআর কঙ্গো। সেই আত্মবিশ্বাসেরই পুরস্কার পায় তারা সপ্তম মিনিটে। ডান প্রান্ত থেকে শানসেল এমবেম্বার বাড়ানো বল ডি-বক্সে পেয়ে ব্রায়ান সিপেঙ্গা জোরালো শটে বল জড়ান জালে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটি ছিল তার প্রথম গোল, আর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ডিআর কঙ্গোর ইতিহাসে প্রথম গোলও।
প্রত্যাশার বিপরীতে পিছিয়ে পড়ে কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায় ইংল্যান্ড। তবে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে তারা। বলের দখল, আক্রমণের সংখ্যা ও সুযোগ সৃষ্টিতে স্পষ্ট আধিপত্য দেখালেও প্রথমার্ধে সমতায় ফিরতে পারেনি টমাস টুখেলের দল।
৩০তম মিনিটে ডেক্লান রাইসের ক্রস থেকে জুড বেলিংহ্যামের শক্তিশালী হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন ডিআর কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি। ছয় মিনিট পর হ্যারি কেইনের শট শেষ মুহূর্তে ঠেকিয়ে দেন আক্সেল তুয়ানুজিবি। ফিরতি আক্রমণে মার্কাস রাশফোর্ডের শট গোললাইন থেকে প্রতিহত করেন অ্যারন ওয়ান-বিসাকা।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে পেনাল্টির দাবিও তোলে ইংল্যান্ড। ডি-বক্সে দ্রুত বেরিয়ে আসা এমপাসির সঙ্গে সংঘর্ষে মাটিতে পড়ে যান কেইন। তবে রেফারি পেনাল্টি না দিয়ে খেলা চালিয়ে যেতে বলেন। ভিডিও সহকারী রেফারিও মাঠের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
এর কিছুক্ষণ পর ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল ডিআর কঙ্গো। ইয়োয়ান উইসার শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পায় ইংল্যান্ড। অন্যদিকে বিরতির আগে বেলিংহ্যাম ও কেইনের আরও দুটি নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট হয় এমপাসির দুর্দান্ত গোলরক্ষণের কারণে।
দ্বিতীয়ার্ধে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে ইংল্যান্ড। ৫৩তম মিনিটে আবারও বেলিংহ্যামের গোলের সুযোগ রুখে দেন এমপাসি। সময় যত গড়াতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে ইংল্যান্ডের চাপ। শেষ পর্যন্ত ৭৫তম মিনিটে ভাঙে ডিআর কঙ্গোর প্রতিরোধ। বাঁ দিক থেকে অ্যান্থনি গর্ডনের নিখুঁত ক্রসে ছয় গজ বক্সে উঠে হেডে সমতা ফেরান অধিনায়ক হ্যারি কেইন। এমপাসি বলটিতে হাত লাগালেও গোল ঠেকাতে পারেননি।
সমতায় ফেরার পরও থেমে থাকেনি ইংল্যান্ড। নির্ধারিত সময়ের চার মিনিট আগে আবারও গর্ডনের পাস থেকে ডি-বক্সের বাইরে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের দুর্দান্ত শটে জালের ঠিকানা খুঁজে নেন কেইন। বুলেটগতির সেই শটে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। শেষ পর্যন্ত আর সমতায় ফিরতে পারেনি ডিআর কঙ্গো।
ম্যাচে প্রায় ৬০ শতাংশ সময় বলের দখল ছিল ইংল্যান্ডের। ১৬টি শটের মধ্যে সাতটি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে ডিআর কঙ্গো সাতটি শট নিয়ে লক্ষ্যে রাখতে পেরেছিল দুটি।
জোড়া গোলের সুবাদে চলতি বিশ্বকাপে কেইনের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচে। বিশ্বকাপে তার মোট গোল এখন ১৩টি এবং ইংল্যান্ডের জার্সিতে ১১৮ ম্যাচে গোলসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮৪। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পাঁচ গোল করে তিনি জিওফ হার্স্টকে ছাড়িয়ে গেছেন। এই তালিকায় এখন তার সামনে আছেন শুধু গ্যারি লিনেকার। এর আগেই চলতি আসরে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপে প্রথমে গোল হজম করার পর টানা ১৩ ম্যাচ জয়হীন থাকার রেকর্ডও ভাঙল ইংল্যান্ড। এর আগে সর্বশেষ ১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও জয় পেয়েছিল তারা।
কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আগামী সোমবার বাংলাদেশ সময় সকালে দারুণ ছন্দে থাকা সহ-আয়োজক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত চারটি ম্যাচের সবকটিতেই জয় পেয়েছে মেক্সিকো। আট গোল করলেও এখনো কোনো গোল হজম করেনি দলটি। ফলে শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে কঠিন পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে কেইনদের সামনে।
সানা/আপ্র/২/৭/২০২৬