দীর্ঘ ৪০ বছরের সংসার। কৈশোরে প্রেম, মাত্র ১৫ বছর বয়সে আংটিবদল, ১৮ বছর বয়সে বিয়ে। এরপর স্বামী বলিউড অভিনেতা গোবিন্দের সঙ্গে সংসার, সন্তান ও জীবনের নানা লড়াই। তবে এবার নিজের পরিচয়ে বাঁচতে চান গোবিন্দের স্ত্রী সুনীতা আহুজা।
সম্প্রতি কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডায় ব্যক্তিগত জীবন, চিন্তা, কাজের ইচ্ছা এবং গোবিন্দের সঙ্গে মনোমালিন্য নিয়ে কথা বলেছেন সুনীতা। সেখানেই তিনি বলেন, ‘৪০ বছরের সংসার আমার, নিশ্চয়ই কিছু খামতি ছিল। তবে যিনি সংসার ভাঙছেন, স্রষ্টা তাকে দেখে নেবেন।’
কলকাতার বাইপাসসংলগ্ন একটি আবাসনে সুনীতার এই ফ্ল্যাট। প্রায় দেড় বছর পর সেখানে ফিরেছেন তিনি। ফ্ল্যাটের নামফলকে গোবিন্দের নামের নিচে রয়েছে সুনীতার নাম। ঘরের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে দুজনের ছবি ও পুরোনো স্মৃতি। দেওয়ালে রয়েছে সন্তানদের ছবিও।
সুনীতা জানান, মায়ের জন্যই কলকাতায় এই বাড়ি কিনেছিলেন তিনি। তার মা ও মাসি একসময় এখানে থাকতেন। সুনীতার মায়ের বিয়ে হয়েছিল কলকাতায়। তার দিদি-দাদারাও এই শহরেই জন্মেছেন।
কলকাতার প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়ে সুনীতা বলেন, মুম্বাইয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লে কলকাতায় এসে বিশ্রাম নেন। এই শহরের মানুষ তার খুব ভালো লাগে।
সুনীতা নিজেকে আধ্যাত্মিক মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার বাড়ির মন্দিরে সাইবাবার মূর্তির পাশাপাশি রয়েছে দুর্গামূর্তিও। তিনি বলেন, একটা বয়সের পর মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিকতা খুব জরুরি। ৫০ বছর বয়সে তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে আরও মনোযোগী হন। প্রতিদিন ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠে ধ্যান করেন বলেও জানান তিনি।
সুনীতার বিশ্বাস, জীবনে শেষ পর্যন্ত মানুষের স্রষ্টার কাছেই যেতে হয়। কে ঠিক আর কে ভুল, ঈশ্বর সবই জানেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দীর্ঘ বিরতির পর আবার অভিনয় ও কাজের জগতে ফিরতে চান সুনীতা। কলকাতায়ও কাজ করতে চান তিনি। পাশাপাশি হায়দরাবাদ এবং তামিল ও তেলুগু ভাষার চলচ্চিত্রেও কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
তিনি জানান, মুম্বাইয়ে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সেখানে আরও কাজ করেছেন। তার মতে, কাজে মন দিলে অন্য কোনো চিন্তা মাথায় আসে না।
অভিনেত্রী জানান, গোবিন্দকে বিয়ের আগে তার কাছেও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব এসেছিল। গোবিন্দের সঙ্গে ‘তন বদন’ সিনেমায় কাজ করার প্রস্তাবও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তখন বিয়ে ও সংসারকে গুরুত্ব দিয়ে সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
সুনীতা বলেন, ১৫ বছর বয়সে গোবিন্দের সঙ্গে তার আংটিবদল হয়। দশম শ্রেণির পড়াশোনাও শেষ করতে পারেননি। ১৮ বছর বয়সে বিয়ে হয়। তার মা তাকে সংসারে মন দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এখন সন্তানরা বড় হয়ে যাওয়ায় নিজের জন্য কাজ করার সময় এসেছে বলে মনে করছেন তিনি।
নারীদের উদ্দেশে সুনীতার পরামর্শ, জীবনে ইতিবাচক থাকতে হবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। নিজেকে ভালোবাসার পাশাপাশি স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস রাখার কথাও বলেন তিনি। তার মতে, নারীদের কোনো পুরুষের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। এত বছর পর তিনি নিজেকে শুধু গোবিন্দের স্ত্রী হিসেবে নয়, আলাদা পরিচয়ে দেখতে চান।
সম্প্রতি গোবিন্দ ও তার বান্ধবী কোমল রানিকে নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সুনীতা জানান, গোবিন্দের জীবন নিয়ে তিনি কিছু বলতে চান না। তিনি শুধু নিজের বিষয়ে কথা বলতে চান।
তবে নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে সুনীতা বলেন, তিনি স্রষ্টার ওপর সব ছেড়ে দিয়েছেন। তার দাবি, কেউ তাকে কাঁদালে বা তার সংসার ভাঙলে ঈশ্বরই তার বিচার করবেন।
চল্লিশ বছরের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে সুনীতা বলেন, জীবনের সব লড়াই তারা একসঙ্গে করেছেন। তার মতে, সংসারের সব বিষয় শুধু নারীকেই ভাবতে হবে—এমনটা হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘গোবিন্দ আমার ছোটবেলার প্রেম। আমি তো তাও শক্ত হয়ে আছি, কাজ করে যাচ্ছি। যার যেখানে সুখ, খুশি সেখানেই থাকুন। সকলের মুখের হাসি অটুট থাক।’
সুনীতা ও গোবিন্দের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের সঙ্গে সম্প্রতি একটি সিনেমায় কাজ করেছেন সুনীতা। ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি জানান, সন্তানদের কখনো বাবাকে ছেড়ে দিতে বলেননি।
তার ভাষায়, সন্তানদের বাবা গোবিন্দ। তিনি শুধু সন্তানদের নিজের মতো শক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন। ছেলের অভিনয়জীবনের সাফল্য কামনা করে তার সিনেমা সফল হোক বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সম্প্রতি আদালতের বাইরে সুনীতাকে দেখা যাওয়ার পর গুঞ্জন ছড়ায়, তিনি নাকি গোবিন্দকে বিচ্ছেদের আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সুনীতা বলেন, আদালতে যাওয়া মানেই বিচ্ছেদ চাওয়া নয়। সন্তানদের নামে সম্পত্তি করে দেওয়ার বিষয়েও আদালতে যেতে পারেন বলে জানান তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও নিজেকে ইতিবাচক রাখার কথা জানান সুনীতা। তিনি বলেন, একটাই জীবন, তাই সবাইকে আনন্দ করে বাঁচতে হবে। নিজেকে ভালোবাসা, নিজের জন্য বাঁচা এবং নিজের পরিচয় তৈরি করার ওপরও জোর দেন তিনি।
সুনীতার বয়স এখন ৫৬ বছর। এই বয়সে অনেকেই কাজ নিয়ে নতুন করে ভাবেন না, কিন্তু তিনি আবার কাজ করতে চান বলে জানান।
গান শোনা তার অন্যতম শখ। ভজনের পাশাপাশি লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের গান শুনতে ভালোবাসেন তিনি। অভিনয়ের আদর্শ হিসেবে মীনা কুমারীর নামও উল্লেখ করেন।
সাক্ষাৎকারের শেষে গোবিন্দকে কোনো গান উৎসর্গ করতে বলা হলে তিনি তা করতে রাজি হননি। বরং নিজের জন্য মীনা কুমারীর ‘পাকিজা’ সিনেমার একটি গান বেছে নেন এবং গেয়ে শোনান।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা
এসি/আপ্র/০৫/১০/২০২৬