যুদ্ধের অবসান কবে হবে? শান্তি কি সত্যিই ফিরবে? নাকি বিশ্বকে আরো দীর্ঘ, আরো বিস্তৃত এবং আরো অনিশ্চিত সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ সামরিক প্রস্তুতি এই প্রশ্নগুলোকে আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না। প্রায় নয় থেকে দশ হাজার অতিরিক্ত মার্কিন সেনা, তৃতীয় বিমানবাহী রণতরি এবং বিপুল সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। অথচ একই সময়ে কূটনীতির দরজাও খোলা রয়েছে। এই দ্বৈত বাস্তবতাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান নীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। তিনি চুক্তি চান, কিন্তু চুক্তির আগে এমন চাপ সৃষ্টি করছেন যা আলোচনার পরিবেশকেই দুর্বল করে। তিনি শান্তির কথা বলেন, আবার সামরিক শক্তি বাড়ান। তিনি সমঝোতার সম্ভাবনার কথা বলেন, আবার যুদ্ধের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেন না। ইরান যখন সাত দিনের একটি আস্থাবর্ধক পরিকল্পনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও আলোচনা পুনরায় শুরুর প্রস্তাব দিয়েছে, তখন সেটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। একই সময়ে সামরিক চাপও বাড়ছে।
এখানে প্রশ্ন ট্রাম্পের শক্তি নিয়ে নয়; প্রশ্ন শক্তি ব্যবহারের দর্শন নিয়ে। একটি পরাশক্তি যদি মনে করে অর্থনৈতিক অবরোধ, সামরিক অবরোধ ও রণতরি মোতায়েনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে যত বেশি কোণঠাসা করা যাবে, তত দ্রুত কাঙ্ক্ষিত সমঝোতা আদায় সম্ভব হবে, তবে সেই ধারণার বিপরীত ফলও হতে পারে। কোণঠাসা রাষ্ট্র আত্মসমর্পণ না করে পাল্টা আঘাতের পথ বেছে নিতে পারে। ইরান ইতিমধ্যে সম্ভাব্য নতুন হামলার বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালী প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রতিবেদন এসেছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যে যুদ্ধবিরোধী ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল, বর্তমান মেয়াদে তার সঙ্গে এই নীতির স্পষ্ট অমিল দেখা যাচ্ছে। তখন তিনি নতুন বড় যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছিলেন; এখন তাঁর প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে সামরিক চাপ ক্রমেই কূটনীতির সমান্তরাল নয়, বরং তার ওপর প্রাধান্যশীল হয়ে উঠছে। প্রশ্ন তাই স্বাভাবিক—শান্তি যদি লক্ষ্যই হয়, তবে যুদ্ধের সম্ভাবনাকে এত কাছে এনে দাঁড় করানো কেন?
আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা দরকার। হরমুজ প্রণালি কোনো আঞ্চলিক জলপথমাত্র নয়। সেখানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পরিবহন ব্যয় এবং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, সামরিক শক্তি যত বাড়ছে, ভুল হিসাবের মূল্যও তত বাড়ছে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ভুল শনাক্তকরণ, একটি আক্রান্ত জাহাজ কিংবা একটি ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মুহূর্তেই আঞ্চলিক সংঘাতকে বৃহত্তর যুদ্ধে পরিণত করতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তাই এখন প্রশ্নটি খুব সরল: ইতিহাসে তিনি কতটি রণতরি পাঠিয়েছিলেন, সেটি কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি কতটি যুদ্ধ থামাতে পেরেছিলেন, সেটি? শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে নত করা যেতে পারে; কিন্তু স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় কেবল বিশ্বাস, কূটনীতি ও পারস্পরিক নিরাপত্তার ভিত্তিতে। ইতিহাসে রাষ্ট্রনায়কের শক্তির সবচেয়ে বড় প্রমাণ যুদ্ধ শুরু করার ক্ষমতা নয়—যুদ্ধ থামানোর সক্ষমতা। ট্রাম্পের সামনে এখনো সেই পথ খোলা। সেটি বন্ধ করে দিলে শুধু ইরান নয়, অস্থির হবে পুরো বিশ্বব্যবস্থা।
সানা/আপ্র/৫/১০/২০২৬