গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

কলকাতায় হোটেলে কড়াকড়ি, বিপাকে বাংলাদেশি রোগীরা

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:০৫ পিএম, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২১:৪৩ এএম ২০২৬
কলকাতায় হোটেলে কড়াকড়ি, বিপাকে বাংলাদেশি রোগীরা
ছবি

কিছুদিন আগেও জমজমাট থাকা দক্ষিণ কলকাতায় পিয়ারলেস হাসপাতালের কাছে এখন প্রায় কোনো মানুষই দেখা যায় না। নজরদারির জেরে এমন অনেক হোটেলই বন্ধ -ছবি সংগৃহীত

কলকাতার হোটেল ও গেস্টহাউসগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈধ কাগজপত্রের বিষয়ে প্রশাসনের কড়াকড়িতে চরম বিপাকে পড়েছেন চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। হাসপাতালসংলগ্ন অনেক হোটেল ও অতিথিশালা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একদিকে আবাসনের সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেড়েছে ভাড়া। ফলে স্বল্প আয়ের রোগী ও স্বজনদের কেউ কেউ ফুটপাতেও রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

নেত্রকোনার মহম্মদ রফিকুলের বড় ভাই সফিকুলের ক্যানসার ধরা পড়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। বহু কষ্টে মেডিক্যাল ভিসা ও চিকিৎসার খরচ জোগাড় করে গ্রেফতারর শেষে স্ত্রী সালমাকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় পৌঁছান রফিকুল। তাঁরা মধ্য কলকাতার একটি গেস্টহাউসে ওঠেন। হাসপাতালে এক রাত থেকে কেমোথেরাপি নিয়ে ছাড়ার পর আরো কয়েকটি পরীক্ষা করানোর জন্য তিন দিন সেখানে থাকার কথা ছিল।

কিন্তু অগ্রিম টাকা নেওয়ার পরও প্রথম রাতেই তাঁদের গেস্টহাউস ছাড়তে বলা হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মালপত্রসহ তাঁদের বাকি টাকা ফেরত দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। পরে আশপাশে অন্য হোটেল ও গেস্টহাউসে থাকার চেষ্টা করেও জায়গা পাননি তাঁরা। শেষ পর্যন্ত রোগীসহ পরিবারের সদস্যদের ফুটপাতে প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে রাত কাটাতে হয়।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রফিকুল বলেন, ‘কেন আমাদের সঙ্গে এমন করা হচ্ছে? আমাদের অপরাধ কী?’

শুধু মধ্য কলকাতা নয়, গত তিন সপ্তাহে শহরের পূর্ব প্রান্তে ই এম বাইপাসসংলগ্ন ডি’সান, মণিপাল, পিয়ারলেস, নারায়ণা আর এন টেগোরসহ বিভিন্ন হাসপাতালের আশপাশেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রশাসনিক নির্দেশে বেশ কিছু হোটেল ও গেস্টহাউস সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোতে ভাড়াও বেড়েছে।

কলকাতা পৌরসভার অভিযানে ৯৬০টি হোটেল ও গেস্টহাউস পরিদর্শনের পর ৯১৯টির বিরুদ্ধে সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিট, এসপ্ল্যানেড, মারকুইস স্ট্রিট, লিন্ডসে স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও কলিন লেনের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এসব এলাকায় বেশ কিছু পুরোনো ভবনে প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অন্যান্য অনুমোদন না থাকার বিষয়ও সামনে এসেছে।

গত ১৯ আগস্ট মধ্য কলকাতার মারকুইস স্ট্রিটের একটি বেসরকারি হোটেলে ভয়াবহ আগুনে অন্তত নয়জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। ঘটনার পর হোটেলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। তদন্তে হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত ছাড়পত্রসহ একাধিক বৈধ অনুমোদন না থাকার তথ্য সামনে আসে। এরপরই কলকাতা শহরজুড়ে অননুমোদিত হোটেল ও গেস্টহাউসের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়।

কলকাতার পৌর কমিশনার স্মিতা পান্ডে জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।

গত দেড় দশকে কলকাতার পূর্ব প্রান্তে ই এম বাইপাসের আশপাশে রুবি, ডি’সান, ফর্টিস, মণিপাল, নারায়ণা আর এন টেগোর ও পিয়ারলেসের মতো একাধিক বড় হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী যেতেন। ২০২৪ সালের শুরুতে এসব চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রোগীদের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাংলাদেশি ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা কমে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে কলকাতার হাসপাতালগুলোতে আবার বাংলাদেশি রোগী বাড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু হোটেল-গেস্টহাউসে প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিযানে সেই প্রবাহ আবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশি রোগীদের বড় অংশের ভরসা ছিল কম খরচের হোটেল ও গেস্টহাউস। মারকুইস স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, ই এম বাইপাস, গড়িয়া, সন্তোষপুর, মুকুন্দপুর, পাটুলি ও কালিন্দী এলাকায় চিকিৎসার জন্য আসা বাংলাদেশিদের থাকার উপযোগী অনেক ছোট হোটেল ও অতিথিশালা গড়ে উঠেছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।

মুকুন্দপুর এলাকায় নারায়ণা আর এন টেগোর হাসপাতালের কাছে একটি গেস্টহাউসের ব্যবস্থাপক রঞ্জন পাইক জানান, স্থানীয় স্টেডিয়ামনগর ও সরকারপাড়ায় অন্তত ৩০টি গেস্টহাউস ও হোটেলে পৌরসভার পরিদর্শকেরা অভিযান চালিয়েছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা সনদ, পুলিশি নিরাপত্তা সনদ ও ব্যবসায়িক লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। বৈধ কাগজপত্র না পাওয়া পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে রঞ্জন পাইক অভিযোগ করেন, বৈধ কাগজপত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় কিছু মালিক ব্যবসা চালু রাখার জন্য পৌর কর্মকর্তাদের একাংশের সঙ্গে অবৈধ আর্থিক সমঝোতায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর দাবি, এ ক্ষেত্রে এক লাখ রুপির ‘প্যাকেজ’ও অঘোষিতভাবে চালু হয়েছে। অভিযোগটির স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

হোটেল-গেস্টহাউস বন্ধের প্রভাব পড়েছে আশপাশের খাবারের হোটেল, ওষুধের দোকান, বিদেশি মুদ্রা বিনিময়কেন্দ্র ও ভ্রমণ ব্যবসাতেও। এসব ব্যবসার বড় অংশ বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ওপর নির্ভরশীল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কলকাতার কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালও উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশি রোগী ও স্বজনদের থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কয়েকটি অনুমোদিত গেস্টহাউসের সঙ্গে চুক্তি করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি বাংলাদেশে গিয়ে রোগীদের নিরাপদ আবাসনের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

উডল্যান্ডস হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী রূপক বড়ুয়া জানিয়েছেন, বাংলাদেশি রোগীদের নিরাপদ হোটেলে থাকার গুরুত্ব বোঝানো হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসার আগে যাতে রোগীরা আবাসন বুক করতে পারেন, সে জন্য আলিপুর এলাকার কয়েকটি গেস্টহাউস ও হোটেলের তালিকা তাঁদের দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কলকাতার আলিপুর এলাকায় তুলনামূলক নিরাপদ ও অনুমোদিত আবাসন থাকলেও সেগুলোর ভাড়া বেশি। ফলে স্বল্প আয়ের রোগীদের জন্য সেগুলো সব সময় সহজলভ্য নয়। অন্যদিকে শতবর্ষী ভবনে পরিচালিত অনেক ছোট হোটেল ও গেস্টহাউসের অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র পেতে মূল ভবনের নকশাসহ বিভিন্ন নথি প্রয়োজন হচ্ছে। পুরোনো ভবনের ক্ষেত্রে এসব নথি সংগ্রহ করাই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিরাপত্তার স্বার্থে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ হোটেল বন্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আপত্তি নেই। তবে চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে আসা রোগীদের আবাসনের বিকল্প নিশ্চিত না করে বিপুলসংখ্যক সস্তা হোটেল ও গেস্টহাউস একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়ায় নতুন মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও দ্রুত বৈধতা পাওয়ার সহজ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং নিরাপদ আবাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা চাচ্ছেন।

কলকাতার হাসপাতাল, হোটেল ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ছোট ব্যবসায়ীদের আশা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত এমন একটি সমাধান বের হবে, যাতে একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন বন্ধ করা যায়, অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য আসা বাংলাদেশি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত থাকে।
সানা/আপ্র/২২/৯/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

সোনিয়ার ভোটার তালিকা মামলা ফের শুনানির নির্দেশ
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সোনিয়ার ভোটার তালিকা মামলা ফের শুনানির নির্দেশ

ভারতের কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর নাম ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার আগেই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার...

দীর্ঘ তিন বছর পর শ্রেণিকক্ষে ফিরলো গাজার শিশুরা
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দীর্ঘ তিন বছর পর শ্রেণিকক্ষে ফিরলো গাজার শিশুরা

প্রায় তিন বছর পর গত শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) প্রথমবারের মতো শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে গাজার লাখ লাখ শিশু। যুদ...

হোয়াইট হাউসে চালু হলো ‘ট্রাম্প টিভি’
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হোয়াইট হাউসে চালু হলো ‘ট্রাম্প টিভি’

যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস ‘ট্রাম্প টিভি’ নামে নতুন একটি সরাসরি সম্প্রচার চ্যানেল চালু করেছে।সোমবার...

যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ বনাম রোবটের লড়াই, শেষ পর্যন্ত জয় কার
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ বনাম রোবটের লড়াই, শেষ পর্যন্ত জয় কার

যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রানসিসকোতে এবার রিংয়ের ভেতর মুখোমুখি হলো মানুষ ও ছয় ফুট লম্বা এক হিউম্যানয়েড রো...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই