ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ও ইউক্রেন মিলিয়ে মোট হতাহতের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস)-এর নতুন এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ হতাহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নিহত, আহত ও নিখোঁজ সেনাসদস্য অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। এতে বলা হয়, দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে এই যুদ্ধে হতাহত হয়েছেন।
গবেষণার লেখক সেথ জি. জোন্স ও রাইলি ম্যাকক্যাবের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সব যুদ্ধ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যত সেনা নিহত হয়েছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার নিহত সেনার সংখ্যা তার চার গুণেরও বেশি। একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়ার সব যুদ্ধ মিলিয়ে নিহত সেনার তুলনায় এই যুদ্ধে রাশিয়ার নিহত সেনার সংখ্যা প্রায় নয় গুণ বেশি।
তবে রাশিয়ার ভেতরে হতাহতের হার সমান নয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চল ও জাতিগত সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে প্রাণহানির হার বেশি। রুশ সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে প্রত্যন্ত গ্রামের পুরুষ জনগোষ্ঠীর বড় অংশের নিহত হওয়ার খবরও ক্রমশ বাড়ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে রাশিয়া যত দ্রুত সেনা হারাচ্ছে, সে হারে নতুন সেনা নিয়োগ দিতে পারছে না।
অন্যদিকে ইউক্রেনের মোট হতাহতের সংখ্যা ৫ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৬ লাখ ২৫ হাজারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়েছে। এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে দেড় লাখ পর্যন্ত।
রাশিয়া বা ইউক্রেন—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মোট হতাহতের তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে সিএসআইএসের এই হিসাব পশ্চিমা বিভিন্ন আগের মূল্যায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, চলতি বছরের প্রথমার্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতির হার আরও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি একজন ইউক্রেনীয় সেনা নিহত, আহত বা নিখোঁজ হওয়ার বিপরীতে রাশিয়ার প্রায় আটজন সেনা হতাহত হচ্ছেন। আগে এই অনুপাত ছিল দুই থেকে তিনজন রুশ সেনার বিপরীতে একজন ইউক্রেনীয় সেনা।
গবেষকদের মতে, ইউক্রেনের ড্রোন কর্মসূচির উন্নতি এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। বিশেষ করে সামনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার রুশ সেনাদের অগ্রসর হওয়া কঠিন করে তুলেছে।
এ ছাড়া রাশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির পেছনে আরও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দুর্বল কৌশল, সমন্বিত সামরিক অভিযানে ব্যর্থতা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, দুর্নীতি এবং সেনাদের নিম্ন মনোবল।
সিএসআইএসের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মোট হতাহতের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ায় ইউক্রেন যুদ্ধ ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। হতাহতের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালের জুলাই থেকে ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্ট্যালিনগ্রাদ (বর্তমান ভলগোগ্রাদ) যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। এটি ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত, যেখানে নিহত, আহত, নিখোঁজ ও বন্দী মিলিয়ে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষ হতাহত হন।
সানা/আপ্র/৩/৭/২০২৬