বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। দুই দিনের সফরে বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটে যান শফিকুর রহমান। বিভিন্ন দলীয় ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকারি দল, যখন যে সরকারে থাকে, আইসাই বলে যে আইনশৃঙ্খলা আগের চেয়ে ভালো। আমি সংসদে কথাটা বলেছি, ওই আগটাকে বুঝলাম না, আর ভালোটাও দেখলাম না। আপনি ভালো বলবেন। পথেঘাটে, রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় ঘরে-দুয়ারে যা ঘটতেছে, ভালো বলবেন?’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ছেলের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নিহত তরুণকে ‘দুষ্টু’ হিসেবে তুলে ধরে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, কেউ দুষ্ট হলে তাকে এভাবে মারধর করার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের ঘটনায় দায়িত্ব এড়িয়ে অন্যের ওপর দায় চাপানোও ভালো লক্ষণ নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাদক ও অস্ত্রের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অন্যদের বিষয়ে খবর রাখলেও নিজের বিষয়ে তা করতে পারছেন না। এ প্রসঙ্গে তিনি ক্ষমতাসীন দলের নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেন।
সিলেটে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, সিলেটে চাঁদাবাজি নেই - এমনটা বলা যাবে না। গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে এসব বিষয় তুলে ধরতে পারলে প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আসবে। সাংবাদিকেরা অনেক সময় চাপের মধ্যে কাজ করেন এবং সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও চাপ থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে চীন, ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই সংকটের চূড়ান্ত সমাধান। একা বাংলাদেশের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় এবং এটি শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক সমস্যা।
শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। তিনিও একাধিকবার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে তাদের দুর্ভোগ দেখেছেন। শুধু সাময়িক অর্থসহায়তা দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না; রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে এবং মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। জ্বালানি বিষয়ে জামায়াতের বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ সরকার গ্রহণ করেনি এবং বিদ্যুৎ নিয়ে তাদের দেওয়া পরিকল্পনাও নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য সরকারকে দায়ী করে শফিকুর রহমান বলেন, গত সাত মাস বা সাড়ে সাত মাসে সংকটের শুরু থেকেই সরকার এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তাঁর দাবি, জনমতের রায় মেনে নেওয়া হলে একই সময়ে দুটি শপথ এবং দুটি ভিন্ন অধিবেশন আহ্বানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতো না।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় চাপের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের চাপের পর সরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। দেশের বাস্তবতা আগে মেনে নিলে সরকার আরও সম্মানিত হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন চেয়েছিল জামায়াত। দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক জায়গায় নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই, ফলে মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী ও স্বাধীন বলা হলেও কমিশন একটি তফসিল ঘোষণা করার পর সেটি বন্ধ করা হলো কেন - এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও সিলেট জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূর, মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির ও সিটি নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী ডা. নূরুল ইসলাম বাবুল, মহানগর সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী এবং জেলা সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীনসহ অন্যরা।
সানা/আপ্র/২৫/৯/২০২৬