গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

মেনু

মাটির শিরায় জলের প্রত্যাবর্তন

কৃষক, খাল ও রাষ্ট্রদর্শনের পুনর্জাগরণ

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৩৩ পিএম, ১৮ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১১:০৬ এএম ২০২৬
কৃষক, খাল ও রাষ্ট্রদর্শনের পুনর্জাগরণ
ছবি

খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেছের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান -ফাইল ছবি

বাংলাদেশের ভূগোল যেন এক জীবন্ত শরীর-তার শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত জলের স্রোতই তাকে প্রাণ দেয়, উর্বরতা দেয়, সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করে। কিন্তু সেই শিরাগুলোই যখন একে একে শুকিয়ে যায়, ভরাট হয়ে যায়, দখলদারিত্বের নির্মমতায় হারিয়ে যায়-তখন কেবল প্রকৃতি নয়, রাষ্ট্রের প্রাণও যেন ক্ষীণ হয়ে আসে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খাল খনন কর্মসূচির পুনরারম্ভ নিছক উন্নয়ন উদ্যোগ নয়; এটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এক প্রয়োজনীয় পুনর্জাগরণ।

স্বাধীনতার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে খাল খননের সূচনা করেছিলেন, তা ছিল বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা ও কৃষিনির্ভর অর্থনীতির গভীর উপলব্ধির ফল। সেই উদ্যোগ কেবল মাটি কাটার কর্মসূচি ছিল না; বরং এটি ছিল পানিপ্রবাহের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা, কৃষিকে শক্তিশালী করা এবং গ্রামীণ জীবনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার এক সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রচিন্তা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পরবর্তী দশকগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা পায়নি। খাল হারিয়েছে, নদী মরে গেছে, আর প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিয়েছে বন্যা, জলাবদ্ধতা ও কৃষি বিপর্যয়ের মাধ্যমে।

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন সময়োপযোগী এবং বাস্তবমুখী এক রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ। দিনাজপুরের সাহাপাড়ায় নিজ হাতে মাটি কেটে তিনি যে সূচনা করেছেন, তা কেবল প্রতীকী উদ্যোগ নয়; বরং এটি একটি বার্তা-রাষ্ট্র তার শিকড়ে ফিরে যেতে চায়, কৃষকের পাশে দাঁড়াতে চায়, এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের নতুন চুক্তি করতে চায়।

বাংলাদেশ ভাটির দেশ। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা বর্ষার ঢল যখন স্বাভাবিক পথ খুঁজে পায় না, তখন তা ধ্বংসের রূপ নেয়। আজ দেশের বহু খাল বিলুপ্ত বা দখল হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের কার্যকর উপায় হলো পরিকল্পিত খাল খনন ও পুনঃখনন। এটি শুধু পানির গতিপথ উন্মুক্ত করবে না; বরং কৃষিক্ষেত্রে সেচের সুযোগ বাড়াবে, উৎপাদন বৃদ্ধি করবে এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে সুসংহত করবে।

খাল মানে কৃষকের আশ্বাস। একটি খাল মানে হাজারো কৃষকের জমিতে পানি, মানে ফসলের সবুজ প্রতিশ্রুতি। একই সঙ্গে খাল হতে পারে মৎস্যসম্পদের আধার। বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে সারা বছর ব্যবহারযোগ্য করে তোলা গেলে ব্যয়বহুল সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমবে। যদি এই খালগুলোতে পরিকল্পিতভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়, তবে দেশীয় প্রজাতির মাছের পুনরুজ্জীবন ঘটবে-যা পুষ্টি, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট-এই কর্মসূচি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; এটি একটি সমন্বিত জনকল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। কৃষক কার্ড, পরিবারভিত্তিক সহায়তা এবং কৃষিঋণের সুবিধার সঙ্গে খাল খনন যুক্ত হলে একটি শক্তিশালী কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে উঠবে। খালেদা জিয়ার সময় থেকে যে কৃষকবান্ধব রাজনীতির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তারই বাস্তব প্রতিফলন এই উদ্যোগে নতুন করে প্রতীয়মান হচ্ছে।

অবশ্যই, এই কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর-স্বচ্ছতা, দখলমুক্তকরণ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতের ওপর। খাল খনন করে যদি আবার তা দখলের শিকার হয়, তবে এই মহৎ উদ্যোগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তাই প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও সামাজিক সচেতনতা-দুই-ই জরুরি।

বাংলাদেশ একদিন ছিল জল, সবুজ আর জীবনের অপরূপ সমন্বয়। সেই হারানো ঐশ্বর্য ফিরে পাওয়ার এই প্রয়াস সফল হলে, এটি কেবল অর্থনীতির নয়-জাতির আত্মার পুনর্জাগরণ ঘটাবে। খাল জাগলে দেশ জাগবে-এই বিশ্বাসই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। 
সানা/আপ্র/১৮/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন
১৯ মে ২০২৬

করের ভারে নয়, সহনশীল নীতিতে বাঁচুক শ্রমজীবী মানুষের জীবন

রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি করব্যবস্থা। নাগরিকের করেই গড়ে ওঠে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য...

আগাম বর্ষণ, নিঃস্ব কৃষক ও জলবায়ুর অশনি বাস্তবতা
১৮ মে ২০২৬

আগাম বর্ষণ, নিঃস্ব কৃষক ও জলবায়ুর অশনি বাস্তবতা

ঋতুচক্রের বিপন্ন সংকেত

জনজীবনের চাপ বাড়িয়ে নয়, চাই ন্যায়ভিত্তিক বাজেট
১৭ মে ২০২৬

জনজীবনের চাপ বাড়িয়ে নয়, চাই ন্যায়ভিত্তিক বাজেট

জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়; একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধ...

পদ্মার বুকে উন্নয়নের মহাসংকল্প, দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার এখনই পরীক্ষার সময়
১৬ মে ২০২৬

পদ্মার বুকে উন্নয়নের মহাসংকল্প, দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার এখনই পরীক্ষার সময়

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বহু দশক ধরে এক নীরব পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভার বহন করে চলেছে। শুষ্ক মৌসুমে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গ্রামীণ ব্যাংকের উচ্চ সুদহার নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে হাইকোর্টের রুল জারি

গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার কেন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদের হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাই কোর্ট। আপনি কি মনে করেন- গ্রামীণ ব্যাংক সবচেয়ে চড়া সুদ আদায় করে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 14 ঘন্টা আগে