মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক হামলা, প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞের প্রেক্ষাপটে এই বিরতি শুধু একটি কূটনৈতিক অগ্রগতি নয়; বরং একটি মানবিক প্রয়োজন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই স্বস্তি ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকবে কিনা, নাকি এটি স্থায়ী শান্তির পথে রূপ নেবে, তা নির্ভর করছে বর্তমান সময়ের বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ও কার্যকর কৌশলের ওপর। এই সংঘাতের বহুমাত্রিক প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল, তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়েছিল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে পড়ে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপ কিছতা লাঘব হয়েছে-তেলের দাম কমেছে, শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরেছে। এটি প্রমাণ করে, একটি আঞ্চলিক সংঘাত কত দ্রুত বৈশ্বিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে। ফলে এই বিরতিকে শুধুমাত্র সামরিক বিরতি হিসেবে না দেখে, বরং একটি অর্থনৈতিক ও মানবিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। তবে বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধবিরতি এখনো ভঙ্গুর। একদিকে ইরান এটিকে ‘সাময়িক সুযোগ’ হিসেবে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজন হলে পুনরায় সংঘাতে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে; অন্যদিকে ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, সংঘাতের মূল কারণগুলো এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তাই কেবল অস্ত্রবিরতি নয়, প্রয়োজন মূল সমস্যাগুলোর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধান। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি বৈঠক নয়, বরং ভবিষ্যৎ শান্তির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছানো। সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং সংলাপ, সমঝোতা এবং আস্থার ভিত্তিতেই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও এখানে অপরিহার্য। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। এখন প্রয়োজন তাদের সক্রিয় ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা- যাতে কোনো পক্ষ একতরফা অবস্থান গ্রহণ করে পরিস্থিতিকে আবারো উত্তপ্ত করে তুলতে না পারে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা জোরদার, বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই মুহূর্তে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে কেবল আস্থার অভাব ও কৌশলগত অনমনীয়তার কারণে। এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা চলবে না। দুই সপ্তাহের এই সময়কে একটি কার্যকর রূপান্তরের পর্যায় হিসেবে ব্যবহার করতে হবে-যেখানে সাময়িক নীরবতা স্থায়ী শান্তির ভিত্তিতে পরিণত হবে। আমাদের প্রত্যাশা একটাই- এ যুদ্ধবিরতি যেন আরেকটি সংঘাতের প্রস্তুতি না হয়ে ওঠে। বরং এটি হোক স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের সূচনা। বিশ্ববাসী যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্তি চায়, চায় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদা। আমরাও যুদ্ধ চাই না, আমরা চাই শান্তি- একটি টেকসই, ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি।
সানা/এসি/আপ্র/৯/৪/২০২৬