গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

মেনু

খাতা মূল্যায়নে অনিয়ম, ন্যায়বিচারের পাল্লা কি ভারসাম্য হারাচ্ছে?

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৩:২৮ পিএম, ১০ মে ২০২৬ | আপডেট: ২১:৩৬ এএম ২০২৬
খাতা মূল্যায়নে অনিয়ম, ন্যায়বিচারের পাল্লা কি ভারসাম্য হারাচ্ছে?
ছবি

ফাইল ছবি

পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নকে ঘিরে সাম্প্রতিক অনিয়মের অভিযোগ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীরতর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যত্যয় নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দায়সারা মনোভাব এবং নৈতিক অবক্ষয়ের একটি প্রতিফলন। যখন দেখা যায়-নিয়োগপ্রাপ্ত পরীক্ষকের পরিবর্তে শিক্ষার্থী বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন, নম্বর প্রদান কিংবা ওএমআর পূরণের মতো দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে-তখন তা কেবল আইনভঙ্গ নয়, এটি মেধার প্রতি অবিচার এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক নির্মম অবহেলা।

শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য জ্ঞানচর্চা, মানবিকতা ও নৈতিকতার বিকাশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো-এই ব্যবস্থার ভিত বহুদিন ধরেই দুর্বল। একজন পরীক্ষককে স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক খাতা মূল্যায়নের চাপ, কোচিংনির্ভর সংস্কৃতি এবং পেশাগত দায়িত্ববোধের অবক্ষয়-সব মিলিয়ে একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করেছে। এই সুযোগে যে অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ছিল সংযত, সুপরিকল্পিত এবং বাস্তবতাভিত্তিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকির ভাষা উচ্চারিত হচ্ছে, যা সমস্যার সমাধান তো নয়ই, বরং পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। একটি ভঙ্গুর ও বহুস্তরীয় সংকটে আক্রান্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল প্রশাসনিক কঠোরতা দিয়ে শুদ্ধ করা সম্ভব-এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

যুগের পর যুগ ধরে গড়ে ওঠা এই দুর্বলতাকে রাতারাতি সংশোধন করা যাবে না-এটি মেনে নেওয়াই প্রজ্ঞার পরিচয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, ধীরস্থির ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং প্রশাসন পারস্পরিক আস্থা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে এগিয়ে আসবেন। শিক্ষকরা কোনো প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অনুগত যন্ত্র নন; আবার শিক্ষার্থীরাও নিছক নিয়ন্ত্রিত সত্তা নয়। শিক্ষা একটি মানবিক সম্পর্কের পরিসর, যেখানে সম্মান, সংলাপ ও সহযোগিতাই প্রধান চালিকাশক্তি।

শিক্ষকতা একটি গভীর নৈতিক পেশা। একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানই করেন না, তিনি মূল্যবোধের নির্মাতা। সেই শিক্ষক যদি নিজের দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দেন, তবে তা পেশাগত বিচ্যুতি তো বটেই, নৈতিক বিচ্যুতিও। উত্তরপত্র মূল্যায়ন একটি সংবেদনশীল ও গোপনীয় প্রক্রিয়া-এখানে অন্য কারো সম্পৃক্ততা অনৈতিক এবং আইনত দণ্ডনীয়। সুতরাং এই জায়গায় শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।

তবে দায় কেবল শিক্ষকের একার নয়। শিক্ষার প্রকৃত সংস্কার শুরু হতে হবে শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নয়ন দিয়ে। যখন পাঠদান হবে অনুসন্ধানভিত্তিক, সৃজনশীল, মানবিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক-তখন মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও স্বাভাবিকভাবেই উন্নত হবে। পরীক্ষার কাঠামো, মূল্যায়নের মানদণ্ড এবং তদারকি ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে না পারলে কেবল কঠোরতা প্রয়োগ করে কাঙিক্ষত ফল অর্জন সম্ভব নয়।

সবচেয়ে বড় কথা-শিক্ষা হতে হবে নৈতিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। নীতি যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই শিক্ষার আলো সমাজকে আলোকিত করে না; বরং অন্ধকারকেই আরো ঘনীভূত করে। আজকের এই সংকট তাই আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা-শুধু অনিয়ম দমন নয়, বরং শিক্ষার আত্মাকে পুনরুদ্ধার করাই এখন সময়ের বড় দাবি।
সানা/আপ্র/১০/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

ঘাটতির ভারে বাজেট, স্বস্তির প্রতীক্ষায় জনতা
০৩ জুলাই ২০২৬

ঘাটতির ভারে বাজেট, স্বস্তির প্রতীক্ষায় জনতা

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট পাস হয়েছে, তা কেবল একটি আর্থিক দলিল নয়; বরং দেশের সামগ্রিক অর...

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার
০২ জুলাই ২০২৬

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার

প্রায় প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর আসছে। এক সময় ডেঙ্গু শুধু রাজধানী ঢাকার সমস্যা হিসে...

সৃজনের দীপ নিভলো, উত্তরাধিকারের নতুন আহ্বান
০১ জুলাই ২০২৬

সৃজনের দীপ নিভলো, উত্তরাধিকারের নতুন আহ্বান

মুস্তাফা মনোয়ারের মহাপ্রয়াণ

মেসি: ফুটবলের আকাশে অনিঃশেষ এক নক্ষত্র
৩০ জুন ২০২৬

মেসি: ফুটবলের আকাশে অনিঃশেষ এক নক্ষত্র

কিছু মানুষ কেবল ইতিহাসের অংশ হন না; ইতিহাসই তাঁদের নাম উচ্চারণ করে নতুন করে লেখা হয়। ফুটবলের অনন্ত ম...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই