সমালোচনা, সংশয় আর বয়সের হিসাব—সবকিছুর জবাব যেন এক রাতেই দিয়ে দিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বিশ্বকাপের মঞ্চে নতুন ইতিহাস গড়ে জোড়া গোলে নেতৃত্ব দিলেন পর্তুগালকে। তার অনবদ্য নৈপুণ্যে উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে বিধ্বস্ত করে নকআউট পর্বের পথে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে রবার্তো মার্তিনেসের দল।
হিউস্টনের রাতটা ছিল পুরোপুরি রোনালদোময়। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর যে দলটিকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, সেই পর্তুগালই এবার দেখা দিল সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। আর সেই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ৪১ বছর বয়সী রোনালদো।
ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই গোলের আভাস দিয়েছিলেন তিনি। নুনো মেন্দেসের ক্রসে অল্পের জন্য বলের সংযোগ না পেলেও পরের মিনিটে আর ভুল করেননি। জোয়াও কানসেলোর নিখুঁত ক্রস প্রথম ছোঁয়াতেই দুর্দান্ত ভলিতে জালে জড়িয়ে পর্তুগালকে এগিয়ে দেন অধিনায়ক।
এই গোলের মধ্য দিয়েই ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দেন রোনালদো। বিশ্বকাপের ছয়টি ভিন্ন আসরে গোল করা প্রথম ফুটবলার এখন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য রেকর্ড নিজের করে নেওয়া এই মহাতারকা আরও একবার প্রমাণ করলেন, বড় মঞ্চে তিনি এখনো কতটা ভয়ংকর।
গোলের পর রোনালদোর উদ্যাপনেও ছিল অন্যরকম আবেগ। যেন কয়েক দিন ধরে জমে থাকা সব চাপ, সব সমালোচনা আর সব প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পেয়েছেন নিজের সবচেয়ে পরিচিত ভাষায়—গোলে।
১৭ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে পর্তুগাল। ডি-বক্সের বাইরে পাওয়া ফ্রি-কিকে সবাই যখন রোনালদোর শটের অপেক্ষায়, তখন প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দিয়ে দুর্দান্ত শটে বল জালে পাঠান নুনো মেন্দেস। রোনালদোর উপস্থিতির কারণেই উজবেক রক্ষণভাগের মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়, আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগান মেন্দেস।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও হাল ছাড়েনি উজবেকিস্তান। ২৯ মিনিটে আজিজ গানিয়েভের দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে তারা গোলের আনন্দে ভাসলেও ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্তে তা বাতিল হয়। আক্রমণের শুরুতে কানসেলোর ওপর ফাউলের প্রমাণ মেলায় গোলটি স্বীকৃতি পায়নি।
উজবেকিস্তানের সেই হতাশা আরও বাড়িয়ে দেন রোনালদো। ৩৯ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেসের অসাধারণ থ্রু পাস ধরে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন তিনি। নিখুঁত ফিনিশিংয়ে করা এই গোলটি শুধু পর্তুগালের ব্যবধানই বাড়ায়নি, ইতিহাসও নতুন করে লিখেছে।
বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে বসেছেন রোনালদো। ১০ গোল নিয়ে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন কিংবদন্তি ইউসেবিওর ৯ গোলের রেকর্ডকে। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে দেশের হয়ে সর্বাধিক গোলের নতুন মালিক এখন তিনিই।
এতেই শেষ নয়। ৪১ বছর ১৩৮ দিন বয়সে বিশ্বকাপের এক ম্যাচে জোড়া গোল করা সবচেয়ে বেশি বয়সী ফুটবলারও হয়ে গেছেন রোনালদো। বয়স যে কেবল একটি সংখ্যা, তা যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন তিনি।
বিরতির আগে হ্যাটট্রিকের সুযোগ হাতছাড়া করলেও দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের ধার কমায়নি পর্তুগাল। ৬০ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেসের কর্নার থেকে জোয়াও ফেলিক্সের ছোঁয়ার পর বল রক্ষণভাগ ও গোলরক্ষকের গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। চতুর্থ গোলের পর ম্যাচের ভাগ্য কার্যত নির্ধারিত হয়ে যায়।
এরপর হ্যাটট্রিকের খোঁজে মরিয়া ছিলেন রোনালদো। ৭৪ মিনিটে দারুণ এক সুযোগ পেলেও উজবেক গোলরক্ষক আবদুভোহিদ নেমাতভ অসাধারণ সেভে তাকে বঞ্চিত করেন।
তবে গোল উৎসব থামেনি। নির্ধারিত সময়ের তিন মিনিট আগে রাফায়েল লেয়াওয়ের জোরালো শটে উজবেকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় পর্তুগাল। ৫-০ গোলের দাপুটে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইউরোপের দলটি।
পরিসংখ্যানেও ছিল পর্তুগালের একচ্ছত্র আধিপত্য। পুরো ম্যাচে ১৭টি শট নিয়ে ৯টি লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয় তারা। বিপরীতে উজবেকিস্তানের ৭টি শটের মাত্র ২টি ছিল লক্ষ্যে।
এই জয়ে দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে ‘কে’ গ্রুপের শীর্ষে উঠে এসেছে পর্তুগাল। প্রথম ম্যাচে হতাশা থাকলেও দ্বিতীয় ম্যাচে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে নকআউট পর্বের পথ অনেকটাই সহজ করে ফেলেছে তারা।
অন্যদিকে রোনালদোও যেন নতুন করে নিজের গল্প লিখলেন। জাতীয় দলের হয়ে চার ম্যাচ পর গোল পেলেন, কাটালেন বড় টুর্নামেন্টে দীর্ঘ গোলখরা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার গোলসংখ্যা এখন ১৪৫, ম্যাচ ২৩০টি।
যখন অনেকেই তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে রোনালদো আবারও দেখালেন কেন তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা। ইতিহাস গড়ার রাতে তিনি শুধু গোলই করেননি, নিজের কিংবদন্তিকেও আরও উজ্জ্বল করেছেন।
সানা/আপ্র/২৪/৬/২০২৬